
খেলার মাঠে নানা ধরনের জুটির দেখা মেলে। একই পরিবারের সদস্যদের একসঙ্গে জুটি বেঁধে খেলতে দেখার দৃষ্টান্তও অনেক। কিন্তু ইংল্যান্ডের উইমেন্স চ্যাম্পিয়নশিপে দেখা মিলল অভিনব এক জুটির। যেখানে একসঙ্গে মা এবং মেয়ে মিলে পরিচালনা করেছেন মেয়েদের ফুটবল ম্যাচ। এই মাসের শুরুতে ব্ল্যাকবার্ন রোভার্স এবং বার্মিংহাম সিটি ম্যাচ দিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছে এ জুটির। এর ফলে পেশাদার কোনো ম্যাচে প্রথমবারের মতো মা-মেয়ের জুটিকে রেফারিং করতে দেখল ফুটবল–দুনিয়া।
একসঙ্গে ম্যাচ পরিচালনা করতে নেমে আলোচনায় আসা সেই মা মেয়ে জুটি হলেন ৫৫ বছর বয়সী লোরেইন ক্যাচপোল এবং তাঁর মেয়ে ২২ বছর বয়সী ফ্রান্সেসকা। দুজনই ম্যাচ পরিচালনা করেন বলে রোববার দিনটা বড্ড ব্যস্ততায় কাটে তাঁদের। তবে একসঙ্গে নিজেদের কাজটা বেশ উপভোগই করেন তাঁরা।
তবে ফ্রান্সেসকা ও লোরেইন যখন একসঙ্গে ম্যাচ পরিচালনা করেন, তখন অবশ্য তাদের মা-মেয়ে বলে কেউ মনেই করেন না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাদের দুই বোন ভাবার ভুলটাই করেন সবাই।ফ্রান্সেসকা ও লোরেইন দুই প্রজন্মের দুই রেফারি। লোরেইনের বয়স ৫৫ হলেও রেফারিদের সংগঠন প্রফেশনাল গেইম ম্যাচ অফিশিয়াল লিমিটেডের (পিজিএমওএল) যে মানদণ্ড তাতে দারুণভাবে উতরে গেছেন তিনি। ৯ বছর আগে লোরেইন যখন যাত্রা শুরু করেছিলেন, তখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, এই বয়সে রেফারি আসলেই সে রেফারি হিসেবে কাজ করতে পারবেন কি না। কিন্তু সেই চ্যালেঞ্জটা দারুণভাবে পেরিয়ে গেছেন লোরেইন।
৫৫ বছর বয়সে এসে রেফারিং করা নিয়ে লোরেইন অবশ্য উৎসাহই পেয়েছেন বেশি। তিনি বলেছেন, ‘তারা বলেছিল, “যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি ফিটনেস পরীক্ষায় পাস করে মানদণ্ডগুলো স্পর্শ করে, তবে তোমার রেফারি হতে না পারার কোনো কারণ নেই।”’
মায়ের এই আগ্রহ ও উৎসাহ অনূদিত হয়েছে মেয়ের মাঝেও। ফ্রান্সেসকার বয়স যখন ১৪, তখনই অর্থ উপার্জনের লক্ষ্যে রেফারিংয়ে কাজ শুরুর সিদ্ধান্ত নেন। নিজে খেলোয়াড় হওয়ায় রেফারি সংকটের বিষয়টিও জানা ছিল তাঁর। ফলে এই সুযোগটা লুফে নিতে চাইলেন ফ্রান্সেসকা। এরপর মেয়েকে রেফারিং কোর্সে নিয়ে যেতে যেতে মা–ও সিদ্ধান্ত নেন কোর্সে ভর্তি হওয়ার। এরপর ইতিহাস।লোরেইন ও ফ্রান্সেসকা শুধু একে অপরের জন্য অনুপ্রেরণা নন, বরং কেন এই পেশায় অন্য নারীদের আসা উচিত তার বিজ্ঞাপনও বটে। রেফারি হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও ফ্রান্সেসকার চোখ শিক্ষকতা পেশার দিকেও। তিনি বর্তমানে ফিজিক্যাল এডুকেশন বিভাগে শিক্ষকতা করার লক্ষ্যে ইউনিভার্সিটি অব ইস্ট অ্যাঙ্গলিয়াতে পড়াশোনা করছেন। এই প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট সবাই তাকে তাঁর কাজের জন্য সহায়তাও করেন, যা ফ্রান্সেসকার অনেক জটিলতাই সহজ করে দিয়েছে। ফ্রান্সেসকা বলেন, ‘রেফারিং চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে স্কুল অনেক সহায়তা করেছে। কারণ, স্কুল এবং মাঠে এমন কিছু আপনি দেখবেন যা আর কোথাও দেখবেন না।’
লোরেইনও একইভাবে কাজের সঙ্গে রেফারিং জীবনকে মানিয়ে নিয়ে চলেছেন। ৩৬ বছর ধরে তিনি ফোর্কলিফ্ট ট্রাকচালকের কাজ করছেন। ফলে নারী কর্মী হিসেবে পুরুষদের মাঝে কাজ করার যে বিড়ম্বনা, তার সবটাই আগে থেকে জানা ছিল তাঁর।
লোরেইন বলেন, ‘আমি যখন শুরু করি, তখন খুব বেশি রেফারিংয়ে যুক্ত ছিল না। ফলে আমি যখন আসলাম, তখন ব্যাপারটা ছিল এমন, “আরে আমরা একজন নারী পেয়েছি”, “আমরা একজন নারী পেয়েছি।” আর আমি বলতাম, “আচ্ছা, আচ্ছা।
শুরুতেই বলা হচ্ছিল মা-মেয়ের রেফারিংয়ের কাজকে উপভোগ করার কথা। কাজটা যে তারা সত্যিই উপভোগ করেন, সেটা বোঝা বাসায় তাঁরা একসঙ্গে ফুটবল ম্যাচ দেখতে বসলে। ম্যাচের পর খেলা বা গোলের চেয়ে রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়েই বেশি কথা হয় তাঁদের। লোরেইন বলেন, ‘ফ্রান্সেসকা প্রায় বলেন, “আরে আমাদের ধারাভাষ্য দেওয়ার কী দরকার!”’ তবে পরিবারের মধ্যে শুধু এ দুজনই নন, লোরেইনের স্বামী শন এবং ছেলে টবিও রেফারি। ফলে শেষ পর্যন্ত এই আলাপ এড়ানোর সুযোগ আর থাকে না।
এ দুজনে জীবনে রেফারিং শুধু এখন নিছক পেশা বা সময় কাটানোর মাধ্যম নয়। এর মধ্য দিয়ে জীবনের নতুন পাঠও নিচ্ছেন তাঁরা। এর মধ্যে কীভাবে কঠিন পরিস্থিতিতে মানুষকে সামলাতে হয় এবং তাঁদের সঙ্গে কথা বলতে হয় সেই শিক্ষাও পাচ্ছেন তাঁরা।
লোরেইন, ‘আপনি নিশ্চিতভাবেই রেফারি হিসেবে মাঠে রাগান্বিত হতে পারবেন না। ফলে আপনাকে চেষ্টা করতে হবে নিজের অনুভূতিকে সামলানোর এবং সবকিছু থামিয়ে দিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার।’ পাশাপাশি কাজকে ভালোবাসার শিক্ষাটাও কি এখান থেকে পাচ্ছেন না তাঁরা!
আপনার মতামত লিখুন :